বৃহস্পতিবার , জুলাই ৯ ২০২০
Home / ফিচার / ময়মনসিংহ বিভাগের তৃতীয় বৃহত্তম শহর মুক্তাগাছা

ময়মনসিংহ বিভাগের তৃতীয় বৃহত্তম শহর মুক্তাগাছা

 

 

 

ময়মনসিংহ, জামালপুর এর পরেই মুক্তাগাছা শহরের অবস্থান। অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ যখন মুক্তাগাছা শহরে প্রবেশ করে তখন অনেকেই ভুলবশত ভাবেন যে তারা ময়মনসিংহ শহরেই চলে এসেছেন। আর স্যাটেলাইট ম্যাপ থেকেই বুঝা যায় মুক্তাগাছা বৃহত্তর ময়মনসিংহের অন্যতম বৃহৎ শহর।।

আর মুক্তাগাছা শহর দেশের অনেক জেলা শহরের তুলনায় বেশ বড়। আশাকরি মুক্তাগাছা পৌরসভাকে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন এবং ময়মনসিংহ মেট্রোপলিটন শহর এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগের আওতায় আনা হবে।

মুক্তাগাছার জমিদারী ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ এবং ঐশ্বর্যমন্ডিত জমিদারী। তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার অর্ধেক অংশের মালিকানা ছিল এই রাজবংশের। তৎকালীন আলাপসিং/ আলাপশাহীর পরগণার রাজধানী ছিল বর্তমান মুক্তাগাছা শহর যা পূর্ব বিনোদবাড়ি নামে পরিচিত ছিল।

মুক্তাগাছা জমিদারীর সীমানা দেওয়ানগঞ্জ হতে শুরু করে কিশোরগঞ্জের ভৈরব এবং মেঘালয়ের সীমান্ত হতে শুরু করে ভালুকার ভাওয়াল পরগণা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব মুর্শিদ খাঁ আমলে তার রাজস্ব বিভাগের সবচেয়ে বিশ্বস্ত কর্মকর্তা ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরী। ১৭২৭ সালে শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরী নবাবের কাছ থেকে তৎকালীন আলাপসিং/আলাপশাহী পরগণার জমিদারী ইজারা নেন। আলাপশাহী পরগণার রাজধানী হচ্ছে বর্তমান মুক্তাগাছা শহর।

আলাপশাহী পরগণার (বিনোদবাড়ইই/মুক্তাগাছা) প্রথম জমিদার শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরী তার জমিদারী এলাকায় বসবাস করতে পারেন নি। তিনি ১৭৩৪ সালে বগুড়ার ঝাকড়ে মারা যান। ১৭৩৪ সালে শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার চার সন্তান রামরাম, হরেরাম, শিবরাম ও বিষ্ণুরাম আচার্য্য চৌধুরী চলে আসেন এই আলাপশাহী পরগণায়।

তারা ব্রহ্মপুত্র নদে শাখা নদী আয়মানের তীরে তাদের চার ভাইয়ের জন্য চারটি পৃথক বসত বাড়ি তৈরী করেন। মুক্তাগাছার জমিদারী হলো ১৬ হিস্যার জমিদারী। যেমন- বড়হিস্যা, মধ্যমহিস্যা, ছোটহিস্যা, আটানী বাজার, দরি চার আনী বাজার উল্লেখযোগ্য।

যা চারভাই মিলে ভাগাভাগি করে নেন। ১৭৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আঠানী জমিদার বাড়ি খ্যাত বর্তমান মুক্তাগাছা রাজবাড়ি। আর তার পাশ্ববর্তী কলেজ ভবন টি হলো জমিদার হরেরামের বাড়ি । মুক্তাগাছা সাবরেজিস্ট্রী অফিস হলো জমিদার রামরামের বাড়ি, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন হলো জমিদার শিবরামের বাড়ি আর জমিদার বিষ্ণুরামের বাড়ির কোন অস্তিত্ব না থাকলেও তার নামে আছে রাজবাড়ির সম্মুখে অবস্থিত বিষ্ণুসাগর নামক বিশালাকার দীঘি। এই জমিদারীর এস্টেটের জমিদাররা কোন সময় রাজা, মহারাজা, রায়বাহাদুর উপাধি পেয়েছিলেন।

এই রাজবংশের সদস্যদের মধ্যে রাজা রামকিশোর আচার্য্য চৌধুরী, রাজা জগৎ কিশোর আচার্য্য চৌধুরী, মহারাজা সূর্য্যকান্ত আচার্য চৌধুরী, মহারাজা শশীকান্ত আচার্য্য চৌধুরী ছিলেন উল্লেখযোগ্য। ১৭৮৭ সালের ১ লা মে ময়মনসিংহ জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে জমিদার রঘুনন্দন আচার্য্য চৌধুরী তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকে মোমেনশাহী পরগণায় জমি দান করেন।

১৮৭৭ সালে মহারাজা সূর্য্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরী তৎকালীন মোমেনশাহী পরগণার (ময়মনসিংহ সদর এবং উত্তর ও দক্ষিণের সকল থানা সমূহ) রাজধানী এবং জেলার সদর দপ্তর ময়মনসিংহে নির্মাণ করেন শশী লজ নামক রাজবাড়ি। যা ১৯০৫ সালে সংস্কার করেন মহারাজা শশীকান্ত আচার্য্য চৌধুরী।

যিনি ১৯২০ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে মহারাজা উপাধি পেয়েছিলেন। মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরী শশীলজ সহ সূর্যকান্ত কালাজ্বর গবেষণা কেন্দ্র (এস কে হাদসপাতাল), রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ নির্মাণে ২ লক্ষ রুপী দান করেছিলেন। রাজা জগৎকিশোর আচার্য্য চৌধুরী তার মাতা রাণী বিদ্যাময়ী দেবী নামে বিদ্যাগঞ্জ রেল স্টেশন এবং ময়মনসিংহ শহরে বিদ্যাময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এবং পিতা জমিদার রামকিশোর আচার্য্য চৌধুরীর নামে মুক্তাগাছায় রামকিশোর স্কুল নির্মাণ করেন।

মহারাজা শশীকান্ত আচার্য্য চৌধুরী ১৯০৫ সালে শশীলজ রাজবাড়ি সংস্কার, আনন্দ মঅঅহন কলেজ নির্মাণে ১০০০০ টাকা অর্থদান। নিজ স্ত্রী রাণী রাজবালার নামে শিল্ড তৈরী। যে শিল্ডের জন্য এককালে ওপার বাংলার মোহন বাগান, ইস্ট বেঙ্গল ক্লাব খেলতে আসতো এই ময়মনসিংহে। এছাড়াও রাণী রাজবালা উচ্চ বিদ্যালয় সহ অনেক জনহিতকর কাজ করেন।

 

তৎকালীন বৃহত্তর ময়য়মনসিং জেলার (১৬ আনা) মধ্যে অর্ধেক অংশ ( ০৮ আনা) এর মালিকানা ছিল মুক্তাগাছার মহারাজাদের। এই কারণে মুক্তাগাছা রাজবাড়িকে আঠানী জমিদার বাড়ি বলা হয়। মুক্তাগাছার রাজা রাজা ভৈরব রায়ের নাম অনুসারে বর্তমান ভৈরব উপজেলার নামকরণ করা হয়। যা ছিল তার জমিদারী এলাকা। এছাড়া তৎকালী কাটাখালীতরে ( বর্তমান কিশোরগঞ্জে) তিনি বত্রিশটি তালুক ক্রয় করেন। যার নাম অনুসারে বত্রিশ নামকরণ করা হয়। এখানে এখনো মহারাজার রাজকাচারী আছে। তৎকালীন কিশোরগঞ্জের প্রামানিক পরিবারের কৃষ্ণদাস প্রামাণিক যার পুত্র নন্দকিশোর প্রামাণিকের নাম অনুসারে কিশোর গঞ্জ নামকরণ করা হয়েছে ধারণা করা হয় তিনি ছিলেন মুক্তাগাছার মহারাজার দেওয়ান এবং খাজনা সংগ্রাহক।

 

তৎকালীন বাংলায় রাণী ভবানী এবং ভাওয়াল পরগণার জমিদারির পরেই ছিল এই আলাপশাহী তথা মুক্তাগাছার জমিদারীর অবস্থান। সম্ভবত মুক্তাগাছার জমিদারী বাংলার ৩য় বৃহত্তম জমিদারী। তৎকালীন সময়ে মুক্তাগাছা জমিদারীর বাৎসরিক আয় ছিল ১১ লক্ষ টাকা। আর সেসময় ওপার বাংলার চব্বিশ পরগণার বাৎসরিক আয় ছিল ৪ লক্ষ টাকা।

আরও পড়ুন

মাশরাফি-করোনা

আরও একবার লেখা হোক আপনার যুদ্ধ জয়ের গল্প

ফিচার: প্রথম প্রথম খুব চমকে উঠতাম। এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। তখন ভাবতাম, কোথায় কোন …