শুক্রবার , নভেম্বর ২৭ ২০২০
Home / ফিচার / জীবনযুদ্ধে হার না মানা ফকির সাহেবের কথা

জীবনযুদ্ধে হার না মানা ফকির সাহেবের কথা

ফিচার : নানা প্রতিকূলতা, চড়াই-উতরাই, পাওয়া-না পাওয়া এসব নিয়েই জীবন। এতসব প্রতিকূলতার মধ্যে অনেকে আবার জীবনযুদ্ধে বিজয়ী হতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পিছু ফিরে না তাকানো তাদের স্বভাব। এমনই একজন মাটির মানুষ রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অন্তরে পিতার দীক্ষা ধারণকরে গানকে তিনি একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান করে নিয়েছেন। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছেন। সবাই তাকে ফকির সাহেব নামেই চেনে। ফকির বলতে আমরা অনেকেই বুঝি, মুখ ভর্তি দাড়ি, গোঁফওয়ালা একজন ভবঘুরে মানুষ। তবে এই ফকির সাহেব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ৪৩ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।

তার জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে আধাপেট খেয়ে, আবার কখনও না খেয়েও দিন কেটে গেছে । কিন্তু কখনো থেমে থাকেননি তিনি। ক্ষুধার কাছে হার মানেননি। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছেন সামনে। নানান গুণের অধিকারী তিনি। দেহতত্ত্ব, মারফতি, পল্লীগান চর্চায় বেশ দখল আছে তার। জীবিকা নির্বাহের জন্য পড়াশুনার পাশাপাশি মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ করেন তিনি। প্রতিমাসে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পান। এছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে ৩ মাস রিকশা চালিয়েছেন। সাভারের একটি গার্মেন্টেসেও কাজ করেছেন। মাঝে মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে দেশীয় বাধ্যযন্ত্রের সাথে গান করেন। ক্যাম্পাসে গান করলে অনেকেই টাকা দিতে চান। কিন্তু তার মায়ের নিষেধ থাকায় কোনো টাকা নেন না। গ্যারেজে কাজ করেই নিজের চলার ও পড়শোনার খরচ চালিয়ে নেন তিনি।

 

ফকির সাহেবের পুরো নাম ওয়াজকুরুনী ফকির। লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা থানার গাওচুল্বা গ্রামে তার জন্ম। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। তার বড় দুই বোন আছে। হাতিবান্ধা এসএস উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং আলিমুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। পড়াশুনা করার জন্য টাকা পয়সা ছিল না । গান শুনে মুগ্ধ হয়ে শৈশব কালের এক বন্ধু কলেজে পড়াশুনার সকল খরচ বহন করেছেন। ২০০০ সালে বয়সে ফকির সাহেবের বাবা মারা যায়। বাবা মারা যাওয়ায় অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়েছে তাঁদের।

নিজের সম্পর্কে প্রশ্ন করলে সাবলীলভাবে উত্তর দেন ফকির সাহেব, আমাকে অনেকে ‘পাগল’ কয়। লালনের গানের এক জায়গায় আছে, ‘লালন বলে মজিয়াছি আপন পিরিতে।’ ক্লাস যখন থাকে না, তখন জঙ্গলে থাকি। মোটরসাইকেল নিয়ে প্রচুর ঘুরি। মানুষের সঙ্গে থাকি না। যে জায়গায় আমাকে কেউ চেনে না, সেখানে গিয়ে বসে থাকি। প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের গান শোনাই। যেখানে প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের স্কুল আছে, সেখানে আমি আছি। ওদের কাছে যাই ওদের ভাষা বোঝার জন্য। ধরেন, একজন ঠোঁটকাটা। সে-ও হাসবার চায়; কিন্তু পারে না। তাগো কাছে যাই, হাসিঠাট্টা করি। আমার ফিলোসফি হইলো, জীবনটা উদ্‌যাপন করে যাইতে হবে। যাপন তো সবাই করে। বার্ট্রান্ড রাসেল, এস এম সুলতান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ এ রকম বড় লোকগুলো সম্পর্কে পড়েছি এই কারণে—শাহ আব্দুল করিম কইছে, মানুষ থুইয়া খোদা ভজে এই মন্ত্রণা কে দিছে? এই কথা ভালো লাগছে। গান টুকটাক লেখি। কয় দিন আগে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর ‘আলফা’ সিনেমা দেখে একটা গান লিখেছি—সখী আমি কোন দেশে যাই/যে দেশে আমার কোনো ঠিকানা নাই! সম্প্রতি কাঠবিড়ালি নামে একটা সিনেমায় কণ্ঠ দিয়েছি, অভিনয়ও করেছি।

বিয়ে, সংসার নিয়ে বলেন, বাড়িতে ২ হাজার লিচুগাছ লাগাইছি। মা-ও আছে। তাগো নিয়ে থাকব। আমার একটা গান আছে, ‘কূল ভাঙা এক নদীর তীরে বান্ধিয়াছি ঘর/ কুনসুম জানি যায় ভেসে যায় আশার বালুচর।’ তাই সংসার করার ইচ্ছা নাই। এক ইহুদি মেয়ের সঙ্গে রিলেশন ছিল বছর দুয়েক। পরে বাদ দিছি। জীবনযুদ্ধে কখনো থেমে থাকেননি তিনি । ৯ বছর বয়সে ভারতের এক গুরুর কাছে ৫ বছর দেহতত্ত্ব ও মারফতি গানের শিক্ষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে হাতিবান্ধার আশরাফ উদ্দিন ভান্ডারির কাছ থেকে দেহতত্ত্ব ও মারফতি গানের শিক্ষা নিচ্ছেন। ফকির সাহেব বলেন, বাবা দেহতত্ত্বের গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। বাবার মুখের শোনা ভাব আছে যার গায়, দেখলে তারে চেনা যায়, সর্ব অঙ্গ তাহার পোড়ারে’ সবচেয়ে প্রিয় গান এখন ক্যাম্পাসেও অনেকে শুনতে চায়। ভবিষ্যতে বড় ধরনের গায়ক হবার ইচ্ছা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন

নক্ষত্রলোকে চলে গেলেন তিনি

নক্ষত্রলোকে চলে গেলেন তিনি

‘নক্ষত্রেরা চুরি করে নিয়ে গেছে/ ফিরিয়ে দেবে না তাকে আর।’ জীবনানন্দের কবিতার মতোই যেন নক্ষত্রলোকে …